যাদুকাটায় বালু উত্তোলন বন্ধ, বিপাকে শ্রমজীবীরা
নিজস্ব প্রতিবেদন: সুনামগঞ্জের সর্ববৃহৎ রাজস্ব বাতিলের জন্য যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের ইজারা কার্যক্রমের ওপর উচ্চ আদালতে করা রিট পিটিশন করেন আগামী দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর আগে ওই মহালে ইজারা কার্যক্রমের ওপর ছয় মাসের যে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট বিভাগ। এ নিয়ে আদালত ‘নো অর্ডার’ দিয়েছেন। সেইসাথে ওই দুই মাসের মধ্যে মহাল থেকে সবধরনের বালু উত্তোলন বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের এমন রায়ের পর জেলার বৃহৎ বালুমহাল দুটি নতুন বাংলা সনের শুরুতেই ইজারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে সুনামগঞ্জ এর সর্বোচ্চ রাজস্ব হারানুর পথে সরকার ।মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের বিচারক রেজাউল হক এই আদেশ দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রিট পিটিশনকারীর আইনজীবী এবি শওকত আলী।
তিনি জানান, যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত সংক্রান্ত মূল রিট পিটিশনটি আগামী দুই মাসের সংশ্লিষ্ট আদালতে নিষ্পত্তির আদেশ দিয়েছেন আদালত। আর স্থগিতাদেশের ওপর ‘নো অর্ডার’ পাস হয়েছে। বাদীপক্ষে আরো ছিলেন অ্যাডভোকেট শওকত আলী,রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুর রউফ। ওই রিট পিটিশনটি দায়ের করেছিলেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছত্রিশ গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম।
এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য ইজারা প্রদানের নিমিত্তে দরপত্র আহ্বান করে জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে, মহাল দুটি পাথরমিশ্রিত দাবি করে এগুলোর মালিকানা খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে এগুলোর ইজারা কার্যক্রম বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন খোরশেদ আলম। জানা যায়, গেল ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারক একেএম আসাদুজ্জামান ও সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমম্বয়ে গঠিত বেঞ্চে ওই রিটের শুনানি হয়। এ সময় দুটি বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন বেঞ্চ। এদিকে, দুটি বালু মহালের বিপরীতে দাখিলকৃত দরপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচন করে ফেলে জেলা প্রশাসন। যাদুকাটা-১ বালুমহালে ৩৩ কোটি টাকায় নাসির উদ্দিন এবং যাদুকাটা-২ বালুমহালের বিপরীতে ৫৫ কোটি টাকা দিয়ে শাহ রুবেল আহমদ সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হন। আদালতের আদেশের ফলে এই কার্যক্রম এখন স্থগিত রয়েছে।
শ্রমিক সরর্দার ফজু মিয়া,আওয়াল মিয়া ও আবুল কালাম জানান,দুষ্কৃতিকারী সিন্ডিকেটরা প্রতি বছর টেন্ডার নোটিশ হওয়ার পর একটা স্ট্রে অর্ডার নিয়ে এসে ইজারাদারদের ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় খুরশেদ আলম এবং ফেরদৌস গং। এরা মামলা বাজ প্রকৃতির লোক এদের কারণে ইজারাদার নিয়মনীতি মেনে বালু উত্তোলন করলেও হয়রানির শিকার হচ্ছে শ্রমিকরা। শুনেছি গত ৯ জুলাইয়ে ভূমি খেকো সিন্ডিকেট প্রধান খোরশেদ আলম এবং ফেরদৌস মিয়া উচ্চ আদালতে রিট করে দুই মাসের জন্য স্থগিত করেছে বালু মহাল। সরকার যদি বালু মহাল উন্মুক্ত করে না দেয় তাহলে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে পড়ে যাবো।
লাউড়েরগড় এলাকার বাসিন্দা শ্রমিকনেতা নজরুল মিয়া ও মনসুর মিয়া বলেন,ঈদের আগে থেকেই যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। নদীতে কাজ না করতে পারায় অভাবের তাড়নায় আমাদের এলাকার হত দরিদ্র শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করছে। নদী উন্মুক্ত হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন হবে। দুষ্কৃতিকারী সিন্ডিকেটের কারণে নদীতে প্রতিনিয়ত নৌ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মিয়ারচর এলাকার একাধিক শ্রমিক সর্দার জানান,যাদুকাটা ১ এর ইজারাদার রতন মিয়ার শ্যালক ডালিম,অলিম,নাঈম মিয়া গংরা ইজারার সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন রাত ৭ টা থেকে ভোর ৬ টা পযর্ন্ত যাদুকাটাস্থ মিয়ারচর খেয়াঘাট এবং বাজার সংলগ্ন তীর কেটে বালু-পাথর উত্তোলন করায় ইজারাদার রতন মিয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিকরা সভা সমাবেশ করেছেন। দুষ্কৃতিকারী খোরশেদ আলম এবং ফেরদৌস মিয়া উচ্চ আদালতে রিট করে দুই মাসের জন্য স্থগিত করায় সরকার এবং শ্রমিকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশ্বম্ভরপুর- তাহিরপুর এই দুটি উপজেলার প্রায় লাখো শ্রমিক ও ব্যবসায়ি কর্মহীন অবস্থায় জীবন যাপন করছেন।
যাদুকাটা ২ বালু মহালের সর্বোচ্চ দরদাতা শাহ রুবেল আহমেদ বলেন,আমি সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয়েছি। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত এবং নৌ-শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যঘাত ঘটানোর জন্যই দীর্ঘ ৪/৫ বছর যাবৎ স্থানীয় একটি ভূমি খেকো সিন্ডিকেট চক্রের প্রধান বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খোরশেদ আলম ও তাহিরপুর উপজেলার ফেরদৌস মিয়া গংরা বালু মহালের লীজ বাজেয়াপ্ত করার পায়তারা করছে। আমি বালু মহাল লীজ পাওয়ার পর পরেই ঐ চক্রটি আমার কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেছে। চাঁদা না দেওয়ায় বিন্ন পন্থায় বালু মিশ্রিত পাথর কোয়ারী উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিট করে দুই মাসের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। এতে করে নৌ পরিবহন শ্রমিক এবং ব্যবসায়িরা কর্মহীন জীবন যাপন করছে। বিজ্ঞ আদালত যদি মহালের বিষয়টি পূণ বিবেচনা করে দুটি মহাল উন্মুক্ত করে দেয় তাহলে হাওর অঞ্চলের খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ যে,উক্ত রিটের যাদুকাটা ১ও ২ টেন্ডার নীতিমালার অংশ বিশেষ হিসেবে অন্য দুটি নির্ভেজাল ঝামেলামুক্ত মহাল দুটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সরকারের বৃহৎ অংকের একটা রাজস্ব স্থগিত হয়ে আছে। ঐ রিট থেকে এগুলোকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সমাধান করে রাজস্ব গ্রহনের জন্য নৌ-শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িরা দাবী জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, আদালতের আদেশ সম্পর্কে এখনো আমরা অবগত হইনি। তবে আদালতে মূল রিটটি শুনানি হলে, আগে থেকেই আমাদের জবাব দেওয়া আছে। বাদবাকি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে আদালতের এখতিয়ার। আদালতের আদেশ অনুযায়ী যাদুকাটা নদীর দুটি বালু মহালের বিপরীতে সবধরণের ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা থেকে প্রশাসন বিরত থাকবে বলে জানান তিনি।
বিআলো/ সবুজ