রাজনীতি ও বিচারে পালাবদলের বছর ২০২৫
বিআলো ডেস্ক: ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থা একসঙ্গে বড় ধরনের মোড় নেয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন দল নিষিদ্ধ হওয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড, রাষ্ট্র সংস্কারের জাতীয় সনদ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন এবং বছরের শেষে খালেদা জিয়ার প্রয়াণ- সব মিলিয়ে বছরজুড়ে দেশ ছিল টানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত
২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসে মে মাসে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম জোরদার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত দেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেখ হাসিনার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড
বছরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায় ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। শেখ হাসিনা পলাতক থাকায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেননি।
রাষ্ট্র সংস্কার ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশন সারা বছর ধরে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে বসে। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’। এতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা এবং সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির মতো মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সনদকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান
২০২৫ সালে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই দলটি প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে দল গঠনের পরপরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জোট রাজনীতি এবং নেতৃত্ব সংকট এনসিপিকে আলোচনায় রাখে। পরে এনসিপিসহ কয়েকটি দল মিলে গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠন করলেও তা স্থায়ী হয়নি।
নির্বাচনের রোডম্যাপ ও তফসিল
বছরের শেষ দিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটাতে নির্বাচনকালীন রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ প্রকাশ করে এবং ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ভোটের দিন নির্ধারণ করে ১২ ফেব্রুয়ারি।
১৬ বছর পর ডাকসু নির্বাচন
ছাত্র রাজনীতিতে ২০২৫ সালও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ১৬ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে জয়ী হন। একই ধারা দেখা যায় জাকসু, রাকসু ও চকসু নির্বাচনেও, যা দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বিচার বিভাগে ঐতিহাসিক পরিবর্তন
বছরজুড়ে বিচারাঙ্গনেও একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ফিরে পাওয়া, গুমের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করে।
হাদি হত্যাকাণ্ডে উত্তাল রাজনীতি
ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিচার ও জামিন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে। এ ঘটনায় রাজপথে প্রতিবাদ জোরালো হয়।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও খালেদা জিয়ার প্রয়াণ
বছরের শেষ প্রান্তে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৮ বছর পর দেশে ফেরেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই আসে আরেকটি বেদনাদায়ক সংবাদ। ৩০ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে একটি যুগের সমাপ্তি টেনে দেয়।
এক বছরের হিসাব
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে সবচেয়ে ঘটনাবহুল ও রূপান্তরমুখী সময়গুলোর একটি। ক্ষমতা, বিচার, সংস্কার এবং বিদায়ের এই বছর ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথচলা নির্ধারণে দীর্ঘদিন প্রভাব রাখবে।
বিআলো/শিলি



