রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতিহারে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্তি: নিসচা প্রতিষ্ঠাতার ধন্যবাদ
৩৩ বছরের আন্দোলনের ফল, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি
নিজস্ব প্রতিবেদক: সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের জাতীয় সংকট। এই ভয়াবহ বাস্তবতার বিরুদ্ধে টানা ৩৩ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দেশের অন্যতম গণআন্দোলন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)। নিসচা প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এই আন্দোলনের সূচনা করেন। সেই সময় থেকেই তিনি নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠাকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
দীর্ঘ ৩৩ বছরের আন্দোলন, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, গবেষণা, পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার আলোকে নিসচা উপলব্ধি করেছে যে, কেবল একক কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি উদ্যোগে সড়ককে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রয়োগ, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং দলমত নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই গত দুই বছর ধরে নিসচা প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করেন। এসব আলোচনায় তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি মানবিক ও জাতীয় সংকট। তাই নির্বাচনী ইশতিহারে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই দাবির প্রেক্ষিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিএনপির ইশতিহারে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও সড়ক দুর্ঘটনারোধে সমন্বিত ও টেকসই কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা, যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সড়কে শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। দলটি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অঙ্গীকারকে নিসচা আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন। বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর পক্ষে নিসচা’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় এ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এ যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক না কেন, শুধু ক্ষমতাসীন দলের উদ্যোগেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য বিরোধী দলসহ সকল রাজনৈতিক শক্তির আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের জবাবদিহি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর ভূমিকা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং সর্বস্তরের জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতিহারে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি এবং এটি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের সামাজিক আন্দোলন ও গণচাপের ফলে বিষয়টি এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
মিরাজুল মইন জয় বলেন, নির্বাচনী ইশতিহারে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো যেন কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সরকার গঠনের পর তা দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। চালক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ব্যবস্থার সংস্কার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, পথচারী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সড়কে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
নিরাপদ সড়ক চাই বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার যদি বাস্তব রূপ পায় এবং সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে বাংলাদেশে একটি মানবিক, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। নিসচা ভবিষ্যতেও দলমত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে কাজ করে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।
বিআলো/তুরাগ



