লাভজনক নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার দেশবিরোধী তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগকে দেশবিরোধী তৎপরতা আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এ বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতা ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য, গণমুক্তি ইউনিয়নের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন আহমেদ নাসু, বাসদ (মাহবুব) কেন্দ্রীয় নেতা মহিন উদ্দিন চৌধুরী লিটন, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা এবং বাংলাদেশের সোস্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম।
সমাবেশ থেকে লালদিয়ার চর ও পানগাও টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিল, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
নেতৃবৃন্দ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। এর আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, তেল শোধনাগার ও বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা রয়েছে। ফলে এই বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
তারা বলেন, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একটি অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই দেশের সর্বাধিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে এবং নিজস্ব অর্থায়নেই টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবছর এই টার্মিনাল থেকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হয়। তা সত্ত্বেও কেন এটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দিতে হবে—এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সরকারের কাছে নেই।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর চুক্তি রয়েছে। এই কোম্পানি যে দেশেই বন্দর পরিচালনা করে, সেখানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নোঙর, রিফুয়েলিং ও মেরামতের সুযোগ পায়। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ পরিচালনা করছে। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে, ৪ কোটি ৭ লাখ শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষণা করা হয়নি। অথচ মাত্র ২২ লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্য আড়াই গুণ বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বৈষম্য ও দারিদ্র্য আরও বেড়েছে এবং এক বছরে ১০ হাজার নতুন কোটিপতির জন্ম হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের কাছে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় ছিল। আর বর্তমান সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে দেশ বিকিয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তির ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারমূল্যের চেয়ে প্রতি টনে ৯ হাজার টাকা বেশি দামে গম আমদানি করতে হচ্ছে। একইভাবে বেশি দামে এলএনজি কেনা, বোয়িং বিমান ক্রয় ও সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, জনগণকে না জানিয়ে ইতোমধ্যে লালদিয়ার চর ও পানগাও টার্মিনাল ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এনসিটি ইজারা চুক্তি এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ দেশকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার নেই। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সরকারের দায়িত্ব কেবল রুটিন কাজ ও নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি ও দেশবিরোধী।
সমাবেশ থেকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান, মব সন্ত্রাসে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাম্রাজ্যবাদী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিল এবং নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা না দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।
বিআলো/তুরাগ



