নাঙ্গলকোটে তিন সহোদরের দাদন ও সুদি কারবারে সর্বস্বান্ত শত শত পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার লাঙ্গলকোট উপজেলার পেরিয়া ইউনিয়নের তিন সহোদরের (বাচ্চু মিয়া মেম্বার, মিজান মিয়া ও আমান উল্লাহ) দাদন বা সুদি কারবারির যাঁতাকলের সর্বস্বান্ত শত শত পরিবার। অসহায় এ মানুষগুলো পরবর্তীতে যেন আইনের আশ্রয় নিতে না পারে এজন্য সুদের টাকা দেওয়ার পরে তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক স্টাম্প ও ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান করে ও সরেজমিন ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
সুদখোর ও দাদনব্যবসায়ী বাচ্চু মেম্বরের কাছ থেকে পেরিয়া ইউনিয়নের কাকৈরতলার আবুল বশর বুশ উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে প্রায় ৪ বিঘা জমি বিক্রি করে এখন সর্বস্বান্ত। এক সময়ের গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার ছিল আবুল বশর। বর্তমানে ঋণগ্রস্ত হয়ে তার একমাত্র ছেলে এখন ড্রাইভিং করে জীবনসংসার চালায়। কাকৈরতলা মুন্সিবসড়ির সাইফুল ইসলামকে সামাজিক তুচ্ছ বিষয়ের জেরে বাজারে আটকিয়ে তিন সহোদর শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
কাকৈরতলার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য খন্দকার আবুল হোসেনকে কাকৈরতলা বাজারে সারাদিন আটক করে রাখে দাদনব্যবসায়ী বাচ্চু মেম্বর ও তার লোকজন। পরে পুলিশের সহযোগিতায় ছাড়া পায়। পরে সালিশ হলে দেখা যায়, আবুল হোসেন বাচ্চু মিয়ার কাছ থেকে কোনো টাকাই নেননি। আবুল হোসেনের অপরাধ ছিল, তাদের অপকর্মের বিরোধিতা করা। যারাই তাদের অপকর্মের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাদেরই বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। তিন সহোদর বাচ্চু মিয়া মেম্বার, মিজান মিয়া ও আমান উল্লাহর স্বেচ্ছাচারি কর্মকাণ্ডের ফলে প্রায় ৬০ বছরের প্রতিষ্ঠিত কাকৈরতলা বাজারের ঐতিহাসিক ঈদগাঁ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কাকৈরতলা, বড়সাঙ্গীশ্বর, কাদবা, কলমিয়া, নোয়াপাড়া- এই ৫ গ্রামের মানুষ একসঙ্গে এক ঈদগাঁয় নামাজ পড়তেন। আজ ৫ গ্রামের মানুষ ৫টি জামাতসহ তাদের গ্রাম কাকৈরতলায় দু-তিনটি জামাত হয়। কাকৈরতলার ওহাব মিয়া, সুদের টাকা না দিতে পারায় টিনের ঘর খুলে নেয় সুদখোর বাচ্চু মিয়া। একই গ্রামের নুরু পাগলার স্ত্রীর জমি লিখে নেয় বাচ্চু মিয়া নিজের নামে। মৃত আবদুল হালেমের জমাকৃত ১ লাখ মেরে দেয় বাচ্চু মিয়া। মৃত হেবু মিয়ার স্ত্রীকে সুদের টাকার জন্য শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। মাস্টার কামাল হোসেনের দরবারে নাজেল করে হালের বলদ নিয়ে যায় বাচ্চু। সুদের টাকা দিতে না পারায় বড়সাঙ্গীশ্বরের আবুল কালাম মজুমদারের গরু নিয়ে আসে দাদন ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া। মিজান কলমিয়ার মাওলানা সিহাবের কাছে জমা রাখা ৫ লাখ টাকা পরে সুদসহ আদায় করে। কাদবার রিকশার চালক মৃত আবদুল মালেক সুদের টাকার জন্য বসতভিটা লিখে নেয় বাচ্চু মিয়া। বড়সাঙ্গীশ্বরের মোয়াজ্জেম হোসেনের সুদের টাকার জন্য জমি লিখে নেয়। কাকৈরতলার মাহবুবুল হক ড্রাইভারকে বাজারে আটকে রেখে মারধর করে বাচ্চু মিয়া। কাকৈরতলার ওমর ফারুকের বাজারের একটি দোকান লিখে নেয় বাচ্চু মিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, তিন ভাইয়ের ঘর তল্লাশি করলে তাদের কাছে থাকা সাধারণ মানুষের ব্ল্যাংক স্টাম্প ও ব্ল্যাংক চেক পাওয়া যাবে।
২০১৫ সালে কাকৈরতলার ইদু মিয়ার ছেলে শাহিন (১৪) হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তিন ভাইয়ের যোগসাজশ রয়েছে বলে গ্রামের লোকজন জানান। প্রভাবশালী হওয়ায় গবির ইদু মিয়া আজও ছেলে হত্যার বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। মূল সন্দেহভাজন আসামি ওয়ার্কসপ মিজানের কাছ থেকে মোটা অঙ্গের টাকা খেয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বাচ্চু মেম্বার দৈনিক বাংলাদেশের আলোকে বলেন, আমার বিষয়ে যারা অভিযোগ করেছেন তাদের মামলা করতে বলেন। আপনি যাদের নাম বলছেন তাদের অনেকেই আমার কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে বিভিন্ন কাজে লাগিয়েছেন। আমাদের সমিতি রয়েছে সেখান থেকে অনেকেই সুদে ঋণ নিয়ে থাকে। তবে তিনি স্বীকার করে বলেন, এই সমিতিটি সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নিবন্ধিত না। আমি তো কারো বাড়ি গিয়ে সুদের টাকা দিয়ে আসি না। যদি কারো কোনো অভিযোগ থাকে তারা এই বিষয়ে মামলা করুক। আমার বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন যেগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে আমি মনে করি। তবে যাদের অভিযোগ রয়েছে তারা চাইলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। যে ব্যক্তি আপনাদের নিকট অভিযোগ করেছেন তাকে আমার সামনে নিয়ে আসুন। কাকৈরতলার ইদু মিয়ার ছেলে শাহিন (১৪) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমি ও আমার পরিবার জড়িত নই।
মিজান মিয়া বলেন, আমাদের সম্মান নষ্ট করতে যে সকল ব্যক্তি আপনাদের নিকট অভিযোগ করেছে তাদের নাম বলুন। সরেজমিনে এসে আপনার খোঁজ-খবর নিতে পারেন আমাদের সম্পর্কে। কেউ আমাদের বিরুদ্ধে বাজে কথা বলতে পারবে না।
আমান উল্লাহ বলেন: কিছুদিন আগে থানায়ও আমাদের নামে অভিযোগ করেছে। কিন্তু কেউ কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এ সকল ভিত্তিহীন কথা বলে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করবেন না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট মো. পারভেজ হোসেন বলেন, ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যক্তি দাদন বা সুদি কারবার করা বাংলাদেশের আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি গ্রাম আদালতের মাধ্যমে স্থানীয় চেয়ারম্যান এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এসব বিষয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী এডভোকেট বদিউল আলম সুজন বলেন, ব্ল্যাংক স্টাম্প ও ব্ল্যাংক চেক নেওয়া আমলযোগ্য অপরাধ। আইনের আশ্রয় নিতে পারেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। কোনো কারণে চেক বা স্টাম্প সম্পাদন করতে হলে অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় পেরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির মজুমদার বলেন, সুদ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধ। আর রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া এ জাতীয় ব্যবসা করতে পারেন না। আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়, যে সকল ব্যক্তি এহেন ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে। লাঙ্গলকোট থানা ওসি আবদুর নুর বলেন, সমাজের এই ক্যান্সার নির্মূলে কেউ থানায় অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নিবো।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি লাঙ্গলকোট সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বলেন, সুদ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ডুকে গেছে সুদের কারবার, এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারের কঠিন প্রদক্ষেপ কামনা করি। এটা আমাদের ধর্মের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক, বন্ধ হলে আল্লাহর কাছ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। দাদন বা সুদি ব্যবসা পাকাপোক্ত করতে দুই ভাই বাচ্চু মিয়া ও আমান উল্লাহ আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
ইমরান/বি আলো