• যোগাযোগ
  • অভিযোগ
  • সংবাদ দিন
  • ই-পেপার
    • ঢাকা, বাংলাদেশ

    আনন্দে বাঁচো, ভালোবাসায়, জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে বড় সুখ 

     dailybangla 
    09th Feb 2026 9:03 pm  |  অনলাইন সংস্করণ

    আধুনিক জীবন মানেই দৌড়—সময়কে ধরে রাখার দৌড়, সাফল্য ছোঁয়ার দৌড়, আর কখনো কখনো অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দৌড়। এই নিরন্তর ছুটে চলার মাঝে আমরা এক অদ্ভুত সত্য ভুলে যাচ্ছি—জীবন শুধুই টিকে থাকার নাম নয়, জীবন আনন্দে বাঁচার, ভালোবাসায় ভিজে থাকার নাম। আজকের সমাজে মানুষ আর্থিকভাবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বচ্ছল, প্রযুক্তিগতভাবে বেশি শক্তিশালী; অথচ মানসিকভাবে ক্লান্ত, বিষণ্ন ও একাকী। প্রশ্ন জাগে—সমস্যাটা কোথায়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনদর্শনে। আমরা জীবনের ফলাফলকে বড় করে দেখছি, কিন্তু পথচলাটাকেই উপভোগ করতে ভুলে যাচ্ছি।

    সকালটা শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে। চোখ মেলার আগেই মাথার ভেতর ঢুকে পড়ে দিনের তালিকা—কোথায় যেতে হবে, কী কী কাজ শেষ করতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। ঘড়ির কাঁটা যেন প্রতিদিন একটু বেশি দ্রুত চলে। তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বের হওয়া, যানজটে আটকে থাকা, অফিসে পৌঁছে কাজের চাপে ডুবে যাওয়া—এই চক্রে কেটে যাচ্ছে নগরজীবনের বেশির ভাগ মানুষের দিন।এই ব্যস্ততার মাঝেই অনেক সময় হঠাৎ মনে হয়—জীবন কি শুধু এটাই? আমরা কি সত্যিই বাঁচছি, নাকি কেবল দায়িত্বগুলো সামলে যাচ্ছি? এই প্রশ্ন এখন আর ব্যক্তিগত কোনো দুশ্চিন্তা নয়; বরং সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সামষ্টিক অনুভূতি।

    সময় এগিয়েছে, মানুষ কি পেরেছে?

    গত কয়েক দশকে জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, প্রযুক্তির সুবিধা হাতের নাগালে এসেছে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, তথ্য পাওয়া যাচ্ছে মুহূর্তেই। অথচ একই সঙ্গে বেড়েছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ আর একাকিত্ব। মানুষের হাতে সময় কমেনি, কিন্তু সময়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমেছে। একসময় দিনের শেষে মানুষ ক্লান্ত হলেও সন্তুষ্ট থাকত। কারণ কাজের ফাঁকে গল্প ছিল, সম্পর্ক ছিল, অপেক্ষা ছিল। এখন ক্লান্তি আছে, কিন্তু তৃপ্তি কম। এই বাস্তবতায় আনন্দে বাঁচা যেন কঠিন হয়ে উঠেছে, আর ভালোবাসা অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় বিলাস বলে মনে হচ্ছে।

    সুখের ধারণা বদলে গেছে

    সুখ বলতে আমরা এখন প্রায়ই বুঝি অর্জন। ভালো চাকরি, ভালো আয়, সামাজিক অবস্থান—এসবকে সুখের মানদণ্ড ধরা হয়। কিন্তু এসব অর্জনের পরও অনেক মানুষ ভেতরে ভেতরে শূন্যতা অনুভব করেন। কারণ সুখ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর বিষয় নয়; এটি চলার পথে অনুভব করার বিষয়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুখ একটি স্থায়ী অবস্থা নয়। এটি আসে–যায়। কিন্তু যারা আনন্দকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিতে পারেন, তারাই তুলনামূলকভাবে স্থির ও সন্তুষ্ট জীবন যাপন করেন।

    ছোট আনন্দের অবহেলা

    আমরা বড় সুখের গল্পে অভ্যস্ত। বড় সাফল্য, বড় পরিবর্তন, বড় প্রাপ্তি—এসব নিয়েই আলোচনা বেশি। কিন্তু জীবন গড়ে ওঠে ছোট ছোট মুহূর্তে। সেই মুহূর্তগুলো যদি উপেক্ষিত হয়, তবে বড় অর্জনও অনেক সময় অর্থহীন হয়ে ওঠে। সকালের নরম আলো, প্রিয় গানের একটি লাইন, পরিচিত মানুষের হাসি—এসব ছোট আনন্দ চোখে পড়ে না, যদি মন সব সময় ভবিষ্যতের চিন্তায় আটকে থাকে। অথচ এই ছোট অনুভূতিগুলোই মানসিক প্রশান্তির ভিত গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সচেতনভাবে দৈনন্দিন জীবনে আনন্দের ছোট উৎসগুলো খেয়াল করে, তারা চাপ ও হতাশা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামাল দিতে পারে।

    কৃতজ্ঞতার চর্চা

    আনন্দের সঙ্গে কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক গভীর। আমরা প্রায়ই যা নেই, তা নিয়ে বেশি ভাবি। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করি। এই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় অসন্তোষ, হীনম্মন্যতা ও হতাশা। কৃতজ্ঞতার চর্চা মানে নিজের জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো সচেতনভাবে দেখা। প্রতিদিনের জীবনে এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলো আমরা স্বাভাবিক ধরে নিই—স্বাস্থ্য, পরিবার, কাজের সুযোগ, নিরাপত্তা। এসবের প্রতি কৃতজ্ঞতা মানুষকে মানসিকভাবে আরও স্থিতিশীল করে তোলে। দিনের শেষে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ভাবা—আজ কী ভালো হয়েছে—এই ছোট অভ্যাসটি ধীরে ধীরে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।

    ভালোবাসা: জীবনের কেন্দ্র

    ভালোবাসা ছাড়া জীবন অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। পরিবারে ভালোবাসা নিরাপত্তা দেয়, বন্ধুত্বে ভালোবাসা নির্ভরতার জায়গা তৈরি করে, আর সমাজে ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে তোলে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সম্পর্কের জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। কথা বলার সময় কমছে, মন দিয়ে শোনার অভ্যাসও কমে যাচ্ছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে জমে উঠছে না-বলা কষ্ট। ভালোবাসা মানে সব সময় বড় কিছু করা নয়। সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে শোনা, পাশে থাকার অনুভূতি দেওয়া—এই ছোট আচরণগুলোই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে।

    একাকিত্বের বাস্তবতা

    আজকের সমাজে একাকিত্ব একটি নীরব সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ অনেকের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু বাস্তবে গভীর সম্পর্কের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেকেই কষ্ট পেলে জানেন না, কার কাছে বলবেন। দীর্ঘমেয়াদি একাকিত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হতাশা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব—এসব সমস্যার সঙ্গে একাকিত্বের সম্পর্ক গভীর। ভালোবাসা ও সংযোগ এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক।

    কর্মজীবন ও আনন্দ

    কর্মক্ষেত্র আজ জীবনের বড় অংশ জুড়ে আছে। সেখানে যদি আনন্দের জায়গা না থাকে, তবে জীবন ভারসাম্য হারায়। অনেকেই কাজ করেন কেবল প্রয়োজনের তাগিদে, ভালোবাসা থেকে নয়। কিন্তু কাজের মধ্যেও অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। নিজের কাজ অন্যের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটি বোঝা মানুষকে ভেতরে ভেতরে তৃপ্তি দেয়। সহকর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠলে কর্মপরিবেশ আরও মানবিক হয়। একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ কেবল উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, মানুষের মানসিক সুস্থতাও রক্ষা করে।

    ব্যর্থতা, কষ্ট ও গ্রহণ

    জীবন কখনোই একরকম থাকে না। ব্যর্থতা আসে, পরিকল্পনা ভেঙে যায়, প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্টও আসে। এই অভিজ্ঞতাগুলো এড়িয়ে চলা যায় না। আনন্দে বাঁচা মানে কষ্টকে অস্বীকার করা নয়। বরং কষ্টকে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া এবং সেখান থেকে শেখার চেষ্টা করাই পরিণত জীবনবোধের পরিচয়। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, ভুলকে ক্ষমা করা—এই চর্চাই মানুষকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করে।

    ধীর হওয়ার প্রয়োজন

    এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধীর হওয়া। সবকিছু দ্রুত করার প্রবণতা আমাদের ভেতরের ছন্দ নষ্ট করে দিয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর হওয়া এখন এক ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত। কিছু সময় মোবাইল থেকে দূরে থাকা, প্রকৃতির দিকে তাকানো, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা—এসব অভ্যাস মানুষকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। এতে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে তৈরি হয়।

    জীবনের সঙ্গে বন্ধুত্ব

    জীবন সব সময় আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। কিন্তু জীবনকে যদি শত্রু নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখা যায়, তবে তার ওঠানামা সহজে গ্রহণ করা যায়। আনন্দ ও ভালোবাসা এই বন্ধুত্বের ভিত্তি। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই থামতে হয় বড় কিছু শুরু করার আগে। সুতরাং, শুরু করো, থামো, বিরতি নাও, ভাবো, নিজেকে সময় দাও আবার পুন্যদম্মে শুরু করো। জীবন সুন্দর। প্রতি মুহূর্তেই বলতে হবে আলহামদুলিল্লাহ, জীবন সুন্দর।  আমাদের তাকাতে হবে পাখির দিকে, দেখতে হবে সবুজ – সুন্দরকে, যেতে হবে পাহাড়ের কাছে। শুনতে হবে সমদ্রের গর্জন।

    শেষ কথা

    জীবন খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু গভীর। আমরা যদি কেবল অর্জনের হিসাবেই জীবনকে মাপি, তবে অনেক অনুভূতি অগোচরেই হারিয়ে যাবে। আনন্দ কোনো বিলাসিতা নয়, ভালোবাসা কোনো দুর্বলতা নয়—এগুলোই মানুষকে পূর্ণ করে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি আমরা সচেতনভাবে আনন্দ ও ভালোবাসাকে জায়গা দিতে পারি, তবে জীবন শুধু ব্যস্ত সময়ের গল্প নয়—হয়ে উঠবে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা, অনুভবের উৎসব। জীবন খুব ছোট, অথচ আমরা তাকে খুব কঠিন করে তুলেছি। হিসাবের খাতায় জীবন মাপতে গিয়ে অনুভূতির রং হারিয়ে ফেলছি। এখনই সময় থেমে দাঁড়ানোর—একটু গভীর শ্বাস নেওয়ার, চারপাশে তাকানোর, আর মনে করিয়ে দেওয়ার—

    জীবন বাঁচার জন্যই জীবন।
    আনন্দে বাঁচো, ভালোবাসায় বাঁচো—এই হোক আমাদের প্রতিদিনের অঙ্গীকার।

    লেখক : রবিউল আলম মুন্না

    অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, ব্র্যান্ড এন্ড কমিউনিকেশনস ডিপার্টমেন্ট, সাউথইস্ট ব্যাংক পি এল সি.

    বিআলো/তুরাগ

    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    February 2026
    M T W T F S S
     1
    2345678
    9101112131415
    16171819202122
    232425262728