আবাসিক এলাকার সংকট ভয়াবহআকার ধারণ করেছে
ভূপেন দাশ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইনে বলা আছেÑচট্টগ্রাম নগরীতে প্রতি বছর অন্তত ৫০ হেক্টর এলাকা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দীর্ঘ ১৭ বছরেও নতুন কোনো বড় পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে নগরীতে পরিকল্পিত আবাসনের সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে।সিডিএ গত ৬৬ বছরে নগরীতে ১২টি আবাসিক এলাকা গড়ে তুলেছে। আবাসিক প্রকল্প ‘অনন্যা’ বাস্তবায়নের দীর্ঘ ১৭ বছরে আর কোনো নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠেনি। এসব আবাসিক এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ প্লটই আজও খালি পড়ে আছে। সলিমপুর ও কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। কল্পলোক ও অনন্যা আবাসিক এলাকাতেও বাড়িঘর নির্মাণ হয়নি বললেই চলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম নগরীতে দুই হাজার একরের বেশি জমিতে পরিকল্পিত আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প এলাকা গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। এতে অন্তত ১২ হাজার প্লট তৈরি করা যেত। অথচ সিডিএ একটি প্লটও তৈরি বা বরাদ্দ দিতে পারেনি। দফায় দফায় উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার নির্ধারিত মৌজা দর এবং হুকুমদখলের প্রচলিত নিয়মের কারণে প্রতিবারই পিছু হটেছে সংস্থাটি। চট্টগ্রামে রেলওয়ের বিশাল খালি জায়গায় সরকারি উদ্যোগে মধ্যবিত্তদের জন্য আবাসন নির্মাণের প্রস্তাবনা থাকলেও, ভূমি জটিলতা ও সরকারি সিদ্ধান্তের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে যেখানে কালুরঘাট, ভাটিয়ারি, ফৌজদারহাট ও সীতাকুন্ডের মতো স্থানগুলোতে আবাসন ও যোগাযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে শহর থেকে দূরে মধ্যবিত্তদের জন্য আবাসিক সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও বাস্তবে এখনো বড় ধরনের কোনো প্রকল্প চালু হয়নি।
আইনে বাধ্যবাধকতা, বাস্তবে অচলাবস্থা : সিডিএ আইন ও চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, ভূমির অপব্যবহার ঠেকাতে, প্রশস্ত সড়ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরিকল্পিত এলাকা না হলে নগরীতে বস্তির বিস্তার ঘটে, সরু রাস্তায় জরুরি যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি বাড়ে।কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর হচ্ছে না। ফলে অপরিকল্পিত বসতি বাড়ছে, বাড়ছে যানজট ও অগ্নিঝুঁকি, সংকুচিত হচ্ছে নাগরিক পরিসর। সিডিএ কর্মকর্তারা বলছেন, মৌজা ভ্যালু নির্ধারণে বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। যেখানে কাঠাপ্রতি বাজারদর দুই লাখ টাকাও নয়, সেখানে মৌজা দর ধরা হয়েছে সাত থেকে ১০ লাখ টাকা। আবার হুকুমদখল করতে হলে সেই মৌজা দরের তিনগুণ টাকা দিতে হয়।
হাটহাজারীর মতো অনুন্নত এলাকায় যেখানে রাস্তাঘাট, পানি কিংবা নাগরিক সুবিধা নেই, সেখানে কাঠাপ্রতি ২০ লাখ টাকার বেশি দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করতে হলে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। জমি অধিগ্রহণের পর উন্নয়ন, সড়ক, ড্রেনেজ ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করতে কাঠাপ্রতি আরও আট থেকে দশ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এতে প্লটের মোট খরচ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। এই প্লট ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতা পাওয়া যাবে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।এই কারণেই ২০১৬ সালে একনেকে অনুমোদিত ২ হাজার ৮৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ‘অনন্যা আবাসিক (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্প আজও আলোর মুখ দেখেনি। পাঁচলাইশ ও কুয়াইশ মৌজা বাদ দিয়ে হাটহাজারীর বাথুয়া ও শিকারপুর মৌজায় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানেও উচ্চ মৌজা দর প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মীরসরাই ও আনোয়ারা ইকোনমিক জোনসহ নগরের বাইরে বড় বড় উন্নয়ন হলেও আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে কর্মজীবীরা শহরমুখী হচ্ছেন। এতে প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে নগরীর লোকসংখ্যা বাড়ছে। পরিকল্পিত আবাসন না থাকায় সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
৬৬ বছরে ১২টি প্রকল্প, ১৭ বছরে শূন্য : ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সিডিএ গত ৬৬ বছরে নগরীতে ১২টি আবাসিক এলাকা গড়ে তুলেছে। এসব এলাকায় মোট ৬ হাজার ৩৬৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ আবাসিক প্রকল্প ‘অনন্যা’ বাস্তবায়িত হয় ২০০৮ সালে। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরে আর কোনো নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠেনি।অথচ এসব আবাসিক এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ প্লটই আজও খালি পড়ে আছে। সলিমপুর ও কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। কল্পলোক ও অনন্যা আবাসিক এলাকাতেও বাড়িঘর নির্মাণ হয়নি বললেই চলে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ না করলে প্লট বরাদ্দ বাতিলের বিধান থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।
অনন্যা আবাসিক: প্লট আছে, বসবাস নেই : ১ হাজার ৭৩৩ প্লটের অনন্যা আবাসিক এলাকায় প্রায় এক যুগেও বসবাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, ড্রেনেজ নেই, আলোকায়ন অপ্রতুল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। রাত নামলেই সেখানে অপরাধী ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। একাধিক খুনের ঘটনাও ঘটেছে।প্লট মালিকরা অভিযোগ করছেন, মাটি ভরাট বা সীমানা দেয়াল দিতে গেলেই স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। কেউ কেউ ইট-বালি সন্ত্রাস ও চুরির শিকার হচ্ছেন। ফলে প্লট থাকলেও বসবাসের সাহস পাচ্ছেন না মালিকরা। সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, চড়া ভূমিমূল্য ও তহবিল সংকট বড় সমস্যা। হুকুমদখল করে আবাসিক এলাকা গড়তে শুরুতেই বিপুল বিনিয়োগ দরকার, যা সিডিএর পক্ষে এখন সম্ভব নয়। তবুও বিকল্প ব্যবস্থায় কিছু করার চেষ্টা করছি।
সিডিএ’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার কাজী হাসান বিন শামস স্বীকার করেন, গত ১৩ বছরে নতুন আবাসিক এলাকা করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। ভূমিমূল্য ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতায় নগরীর আবাসন সংকট তীব্র হচ্ছে। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুবাস বড়ুয়া বলেন, অপরিকল্পিত প্রকল্প ও জবাবদিহির অভাবই মূল সমস্যা। যতদিন প্রকল্প গ্রহণে গবেষণা, বাস্তবতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হবে, ততদিন এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌজা দর যৌক্তিককরণ, হুকুমদখল নীতির সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং মধ্যবিত্তবান্ধব আবাসন মডেল ছাড়া চট্টগ্রামে পরিকল্পিত আবাসন সংকট নিরসন সম্ভব নয়। নইলে আইন থাকলেও পরিকল্পিত শহরের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
বিআলো/আমিনা



