কমিউনিটি ক্লিনিক: আশার আলো না সংকটের ছবি?
বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সংবিধানস্বীকৃত অধিকার হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট। বড় শহরে আধুনিক হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনো প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করেই যাচ্ছে। দারিদ্র্য, দূরত্ব, সচেতনতার অভাব এবং সেবার মান – সব মিলিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা এক কঠিন বাস্তবতা।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা। জনমূখী এ কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে গৃহীত হয় যার বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।মাঝে বেশ কিছুটা সময় এই কার্যক্রমে শৈথিল্য দেখা যায়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের পর ব্যাপকভাবে চালু হয় এই কর্মসূচি। এর আওতায় বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। প্রতিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনেক গ্রামে এই ক্লিনিকই একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ভরসা।
তবে বাস্তব চিত্র সবসময় আশাব্যঞ্জক নয়। বহু কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ওষুধের সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। কোথাও কোথাও নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মী পাওয়া যায় না, আবার অনেক ক্লিনিক নির্ধারিত সময়ের বাইরেও বন্ধ থাকে। ফলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। তদুপরি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও চিকিৎসক সংকট ও অতিরিক্ত রোগীর চাপ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় রোগ মানেই আর্থিক বিপর্যয়। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক হাতের নাগালের মধ্যে থাকলেও আনুষঙ্গিক খরচ, ওষুধ কিনতে বাধ্য হওয়া এবং দীর্ঘ অপেক্ষা অনেককে নিরুৎসাহিত করে। ফলে তারা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাম্য চিকিৎসা বা ব্যয়বহুল বেসরকারি সেবার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা সত্যিকার অর্থে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মান উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না – সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাই হবে মূল চাবিকাঠি। তবেই বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা অধিকার নয়, বাস্তবতায় রূপ নেবে।
মোহাম্মদ আলী
সিনিয়র রিপোর্টার
দৈনিক বাংলাদেশের আলো
বিআলো/তুরাগ



