• যোগাযোগ
  • অভিযোগ
  • সংবাদ দিন
  • ই-পেপার
    • ঢাকা, বাংলাদেশ

    গুজব, প্রতিরোধ ও সচেতনতা 

     dailybangla 
    07th Feb 2026 9:23 pm  |  অনলাইন সংস্করণ

    মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন : ডিজিটাল যুগে তথ্য যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, গুজব তার চেয়েও দ্রুত মানুষকে গ্রাস করে। একটিমাত্র ভুয়া পোস্ট, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও মুহূর্তেই সৃষ্টি করতে পারে আতঙ্ক, ঘৃণা ও সহিংসতা। যার পরিণতি কখনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, কখনো সামাজিক বিপর্যয়, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসে যেমন গুজব ছিল ক্ষমতা দখল ও জনমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার, আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই গুজবকে দিয়েছে অদম্য গতি ও ব্যাপ্তি। ফলে গুজব আর নিছক ভুল তথ্য নয়; এটি পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের এক আধুনিক রূপ।

    যাচাইহীন তথ্য কেবল বিভ্রান্তিই ছড়ায় না, সমাজের স্থিতি ও সম্প্রীতিকেও হুমকির মুখে ফেলে। তাই গুজব প্রতিরোধ এখন ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক কর্তব্য। এই ফিচারে গুজবের ইতিহাস, কৌশল, আধুনিক রূপ, ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধের বাস্তবসম্মত উপায় তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সত্যের পক্ষে সচেতন মানুষই হয়ে ওঠে গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

    মানুষের কৌতূহলজনক তথ্য শেয়ার ও আলোচনা করার প্রবণতার কারণে গুজব মানুষের কাছে অধিকমাত্রায় আকর্ষণীয় হয়। গুজব জনসাধারণের অনুভূতি এবং আচরণকে প্রভাবিত করতে কৌশলগতভাবে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা তথ্য মিশিয়ে মানুষের ক্রিয়াকলাপকে কাজে লাগিয়ে তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে পরিচালিত করে যা তারা অন্যথায় নাও করতে পারে। যে কোনো সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দার সময় গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক এবং উদ্বেগকে বাড়িয়ে জনসাধারণের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

    আধুনিক সময়ে গুজবের জনপ্রিয় বাহন হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফলে অতীতের তুলনায় গুজব এখন অনেক দ্রুতগামী। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেশ কয়েকটি গুজবের ঘটনা মানুষের জানমালের বিপুল ক্ষতিসাধন করেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ইতিহাস জুড়ে গুজবকে রাজনৈতিক প্রচার, ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যাবসায়িক স্বার্থ হাসিলে কারসাজি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সাম্প্রদায়িক উস্কানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে।
    সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে চিত্রকর্ম, কার্টুন, পোস্টার, পুস্তিকা, চলচ্চিত্র, রেডিও, টিভি, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সাইবার স্পেসে বিভিন্নভাবে গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে। বর্তমানে সাধারণত ছবি এডিট করে অহরহ গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে।

    জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এমন বিষয়বস্তু নিয়ে মিথ্যা ও চটকদার ভিডিও তৈরি করে গুজব ছড়ানো হয়। এছাড়াও পুরোনো ভিডিওতে বর্তমান সময়ের কথা ব্যবহার করে নতুন ঘটনার জন্ম দেয়া এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে একজনের চেহারায় তার আর্টিফিসিয়াল ভয়েস যুক্ত করে ডিপ ফেইক প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করে গুজব ছড়ানো হয়।

    পাশাপাশি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রচারিত সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে সংবাদের প্রসঙ্গ বদলে ফেলে বানোয়াট তথ্যকে সত্য বলে প্রচারের মাধ্যমেও গুজব ছড়িয়ে থাকে। বিভিন্ন সময় স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভুল বা বিকৃত অনুবাদ ও মতামত উপস্থাপনের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে। মূলধারার গণমাধ্যম থেকে কাল্পনিক উদ্ধৃতি, সত্য খবর পাল্টে ফেলা, অখ্যাত গণমাধ্যম বা ব্লগের খবর ব্যবহার করে কোনো গবেষণার ফলাফলের ভুল ব্যাখ্যা ও অকার্যকর তুলনার মাধ্যমেও গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভুয়া লোগো ব্যবহার করে থাকে যাতে করে মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায়।

    গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয় ও সময়োপযোগী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি, প্যারোডি, গান, নাটক-নাটিকা বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার ওয়েব সাইটের আদলে ভুয়া ওয়েব সাইট তৈরি করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই ব্যক্তি আক্রোশ থেকে, রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের জন্য কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য গুজব ছড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ নিছক মজার ছলে ভাইরাল হওয়ার জন্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বেশি ভিউ পাওয়া ও আয়ের উদ্দেশ্যে গুজবের কন্টেন্ট তৈরি করে তা সাইবার স্পেসে ছড়িয়ে দেন।

    গুজব মানবসমাজের পুরোনো সমস্যা হলেও বর্তমান সময়ের ডিজিটাল যুগে এর প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত, তীব্র এবং বিস্তৃত। কয়েক সেকেন্ডে একটি ভুয়া তথ্য দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই গুজব শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক বিভাজন, সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই গুজব প্রতিরোধ এখন সামাজিক দায়িত্ব ও নাগরিক কর্তব্য।

    গুজব মূলত মুখে মুখে, মুদ্রিত মাধ্যম এবং আধুনিক যুগে প্রধানত ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টুইটার) পোস্ট, ছবি, ভিডিও, এআই এবং কমেন্ট শেয়ার করার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে, যা দ্রুত ও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে খবর পৌঁছাতে সময় লাগে না, কিন্তু সেই খবর সত্য কি না তা যাচাই করতে আমরা অনেক সময়ই আগ্রহ দেখাই না। ফলশ্রুতিতে গুজব আজ সমাজের জন্য একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর বিপদে পরিণত হয়েছে।

    তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে তথ্য যেমন সহজলভ্য হয়েছে, তেমনি গুজব ছড়ানোর পথও হয়েছে প্রশস্ত ও দ্রুততর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই একটি মিথ্যা তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এই গুজব ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তিন পর্যায়েই মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। ফলে গুজব শনাক্তকরণ ও প্রতিকার আজ সময়ের এক জরুরি দাবি। গুজবের ক্ষতি কেবল বিভ্রান্তি ছড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে এবং কখনো কখনো সহিংসতার জন্ম দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একটা গুজবও বড়ো ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই গুজবকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

    গুজব ও সত্যের পার্থক্য নির্ণয়ের প্রথম শর্ত হলো উৎস যাচাই। তথ্যের উৎস যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো সংবাদ বা দাবি প্রথমে কোথা থেকে এসেছে, তা নির্ভরযোগ্য কি না এই প্রশ্ন করা উচিত। অচেনা পেজ, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বা অজ্ঞাত ওয়েবসাইট থেকে আসা তথ্য সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শিরোনাম ও ভাষার ধরন বিশ্লেষণ করা জরুরি। গুজব সাধারণত অতিরঞ্জিত, আবেগপ্রবণ বা ভয় সৃষ্টিকারী ভাষায় উপস্থাপিত হয়। একাধিক সূত্রে মিলিয়ে দেখা গুজব শনাক্তের কার্যকর উপায়। একটি তথ্য যদি সত্য হয়, তবে তা একাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। একটি মাত্র সূত্রে পাওয়া তথ্যের ওপর ভরসা না করে অন্য উৎসে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।

    ছবি ও ভিডিও যাচাই করা অপরিহার্য। অনেক সময় পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে গুজব ছড়ানো হয়। রিভার্স ইমেজ সার্চ বা ফ্যাক্ট-চেকিং টুল ব্যবহার করে ছবির প্রকৃত উৎস জানা সম্ভব। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম নিয়মিত ভুয়া খবর শনাক্ত করে। সন্দেহজনক তথ্য পেলে এসব প্ল্যাটফর্মে যাচাই করা দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয় প্রতিকারের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের। প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে যে, যাচাইহীন তথ্য শেয়ার করা মানেই গুজবের সহযোগী হওয়া। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে গুজববিরোধী সচেতনতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্য যাচাইয়ের কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

    সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু গুজব এড়িয়ে চলা নয়, বরং যাচাইহীন তথ্য শেয়ার না করা। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশ্ন করতে শিখতে হবে, যাচাই করতে হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতে হবে। কারণ গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো সচেতন মানুষ। গুজব সনাক্তের জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি গুজব ছড়িয়ে পড়ার পথও করেছে প্রশস্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই একটি ভুয়া তথ্য হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যার ফল হতে পারে সামাজিক অস্থিরতা, বিভ্রান্তি এমনকি সহিংসতাও। তাই গুজব সনাক্ত ও প্রতিরোধের কার্যকর পদ্ধতি জানা আজ সময়ের দাবি।

    যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা, যুক্তিবোধ প্রয়োগ করা এবং সত্য জানার আগ্রহই পারে একটি সুস্থ তথ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে। গুজব শনাক্তে ব্যক্তিগত সতর্কতাই সমাজের বড়ো সুরক্ষা। গুজব যাচাইয়ের অনেকগুলো ওয়েব সাইট রয়েছে যেমন পলিটিফেক্ট, ফ্যাক্টচেক ডট অরগ, ওয়াশিংটন পোস্ট ফেক্ট চেকার, স্নুপ্স, ফেক্টচেক ফ্রফম ডিউক রিপোর্টার্স ল্যাব, সাইচেক, ফ্ল্যাকচেক, মিডিয়া বায়স/ফ্যাক্টচেক এবং এনপিআর-এর মতো প্ল্যাটফর্ম।

    গুজব একটি সামাজিক ব্যাধি। এর প্রতিকার কেবল আইন বা প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন নৈতিকতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়। সত্যকে জানার আগ্রহ এবং মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করার সাহসই পারে গুজবমুক্ত, সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে। জব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গুজবের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সবাইকে সচেতন হতে হবে অন্যকে সচেতন করতে হবে এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ অর্জন করতে পারবো।

    লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, জনসংযোগ কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয়।

    বিআলো/আমিনা

    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    February 2026
    M T W T F S S
     1
    2345678
    9101112131415
    16171819202122
    232425262728