প্রচণ্ড শীতে বাঁশির সুরে নির্ঘুম পাহারা – নীরব নিরাপত্তার নাম কফিল
আবদুল হাই খোকন: প্রচণ্ড শীতের রাতে যখন পুরো বাজার এলাকা ঘুমে ঢলে পড়ে, চারপাশে নেমে আসে নীরবতা আর ঘন কুয়াশা—তখনও একজন মানুষ জেগে থাকেন সবার নিরাপত্তার জন্য। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা সদরের বরইছড়ি বাজারে এমনই এক নির্ঘুম প্রহরীর নাম কফিল। এক নামেই সবাই চেনে—নাইটগার্ড কফিল।
শীতের কনকনে বাতাস আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডাকে সঙ্গী করেই প্রতিরাত শুরু হয় তাঁর দায়িত্ব। হাতে বাঁশি নিয়ে তিনি হেঁটে বেড়ান বাজারের প্রতিটি গলি, প্রতিটি মোড়। গভীর রাতে হঠাৎ ভেসে আসে তাঁর বাঁশির সুর—নীরব অন্ধকারে সেই শব্দ যেন জানিয়ে দেয়, বাজার এখনও পাহারায় আছে, কেউ একজন জেগে আছেন সবার জন্য।
দোকানপাট বন্ধ, চারদিকে ঝুলে থাকে তালা। ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু কফিলের চোখে ঘুম নেই। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ঠান্ডার তীব্রতা, ভিজে যায় শরীর, জমে আসে কুয়াশা—তবু তাঁর পায়ের গতি থামে না। বাঁশির সুরে সুরে তিনি জানান দেন নিজের উপস্থিতি, ছড়িয়ে দেন এক ধরনের অদৃশ্য নিরাপত্তা বরইছড়ি বাজারজুড়ে।
স্থানীয় বাজার সমিতির সভাপতি একরাম হোসেন জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই দায়িত্ব পালন করছেন কফিল। তাঁর কোনো বড় দাবি নেই, নেই অভিযোগের ভাষা। চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে তাঁর এই অভিনব পাহারাদারি পদ্ধতি পুরো বাজার এলাকায় আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনেকেই বলেন, গভীর রাতে বাঁশির শব্দ শুনলেই তাঁদের মনে শান্তি আসে—কারণ তখন তারা জানেন, কফিল ডিউটিতে আছেন।
কফিলের সঙ্গে কথা হলে তিনি খুব সাধারণভাবেই নিজের দায়িত্বের কথা বলেন। তাঁর কণ্ঠে নেই কোনো বড় গল্প, নেই আত্মপ্রচার। শুধু বলেন,
“শীতে কষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারলে আমার কষ্টটা আর কষ্ট লাগে না।”
জীবনের কোলাহল, ব্যস্ততা আর আলোর ঝলকানির আড়ালে এমন মানুষগুলো প্রায়ই থেকে যান অগোচরে। আলোচনায় আসেন না, শিরোনাম হন না। অথচ তাঁদের নির্ঘুম রাতের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য দোকান, অসংখ্য জীবিকা, অসংখ্য মানুষের দিনের নিরাপত্তা—বিশেষ করে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার বরইছড়ি বাজারের মতো জনবহুল এলাকায়।
প্রচণ্ড শীতের অন্ধকার রাতে বাঁশির সুরে যে মানুষটি বাজার পাহারা দেন—তিনি শুধু একজন নাইটগার্ড নন। তিনি দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, নীরব বিশ্বাসের মানবিক নাম—কফিল।
বিআলো/ইমরান



