বর্তমান সময়ের আলোচিত এক নাম জেফরি এপস্টিন: লেখক রবিউল আলম মুন্না
ক্ষমতা, অর্থ ও অন্ধকার অপরাধের এক বিতর্কিত অধ্যায়
বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলে এমন কিছু নাম থাকে, যেগুলো শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়—একটি পুরো ব্যবস্থার অন্ধকার দিককে তুলে ধরে। জেফরি এডওয়ার্ড এপস্টিন তেমনই এক নাম। একজন প্রভাবশালী মার্কিন ফিনান্সিয়ার হিসেবে পরিচিত হলেও, বাস্তবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন নিপীড়ন, মানবপাচার এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সন্দেহজনক সম্পর্কের কারণে। জেফরি এপস্টিনের জীবন ও মৃত্যু শুধু একটি অপরাধের গল্প নয়; এটি আইন, রাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি ভয়ংকর উদাহরণ।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
জেফরি এডওয়ার্ড এপস্টিন জন্মগ্রহণ করেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে। একটি মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি এবং পরবর্তীতে কুপার ইউনিয়নে পড়াশোনা শুরু করেন, তবে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেননি। অথচ ডিগ্রি না থাকলেও, গণিত ও অর্থনীতিতে তার দক্ষতা তাকে দ্রুতই অভিজাত মহলে পৌঁছে দেয়।
পেশাগত উত্থান ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য
১৯৭০-এর দশকে এপস্টিন একটি অভিজাত স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখান থেকেই ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর সঙ্গে তার পরিচয় গড়ে ওঠে। পরে তিনি বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক Bear Stearns-এ যোগ দেন এবং দ্রুতই উচ্চপদে পৌঁছান। ১৯৮১ সালে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান J. Epstein & Co. প্রতিষ্ঠা করেন। দাবি করা হতো, এই প্রতিষ্ঠান কেবলমাত্র অতি ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ করত। তবে তার আয়ের প্রকৃত উৎস কখনোই পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না—যা পরবর্তীতে নানা সন্দেহের জন্ম দেয়।
বিলাসবহুল জীবনযাপন
এপস্টিনের মালিকানায় ছিল— নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বিলাসবহুল প্রাসাদ, ফ্লোরিডার পাম বিচে সমুদ্রতীরবর্তী বাড়ি, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ব্যক্তিগত দ্বীপ (Little St. James), ব্যক্তিগত জেট বিমান, যা পরবর্তীতে “Lolita Express” নামে পরিচিতি পায় | এই জীবনযাপন তার ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রমাণ দিলেও, একই সঙ্গে এটি অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ও প্রথম মামলা
২০০৫ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে প্রথমবারের মতো এপস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এক কিশোরী তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। তদন্তে উঠে আসে—এপস্টিন নিয়মিতভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতেন এবং যৌন কাজে বাধ্য করতেন। তদন্তে আরও জানা যায়, এই কাজে ব্যবহৃত হতো—অর্থের লোভ, মিথ্যা চাকরির প্রস্তাব, ভুক্তভোগীদের মাধ্যমে নতুন কিশোরী সংগ্রহ তবু ২০০৮ সালে তিনি মাত্র একটি তুলনামূলকভাবে হালকা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং মাত্র ১৩ মাসের কারাদণ্ড পান, যার বড় অংশেই তিনি দিনের বেলা বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই ঘটনাকে অনেকেই “ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা” হিসেবে আখ্যা দেন। জেফরি এপস্টিন শুধু একজন অপরাধী নন; তিনি একটি ব্যবস্থার প্রতীক—যেখানে অর্থ ও ক্ষমতা থাকলে দীর্ঘদিন অপরাধ আড়াল করা সম্ভব হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে নিজের একটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এপস্টিন চাইতেন, নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত তাঁর বিশাল খামারে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীরা গর্ভধারণ করুক এবং অনেক সন্তান হোক। অভিযোগ আছে, মৃত্যুর আগে এপস্টিন তাঁর ধনসম্পদ ও সামাজিক প্রভাবকে ব্যবহার করে এমন এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন, যা অস্বস্তিকর। বছরের পর বছর ধরে তদন্তকারী ও সাংবাদিকেরা দেখিয়েছেন, এপস্টিন তাঁর আর্থিক সাফল্য নিয়ে বাড়িয়ে বলতেন। তিনি তাঁর গ্রাহকদের পরিচয় ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন। ব্যবসা ও বিজ্ঞানে নিজের ভূমিকার কথাও বাড়িয়ে বলতেন এপস্টিন। তবু অর্থ ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় গ্রেপ্তার ও ফেডারেল মামলা
দীর্ঘ এক দশক নীরবতার পর ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে এপস্টিনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এবার অভিযোগ ছিল আরও গুরুতর— মানবপাচার ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণ, এই মামলায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত আজীবন কারাদণ্ড। তদন্ত নতুন করে শুরু হওয়ায় বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক
এপস্টিনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল তার সামাজিক যোগাযোগ। তার সঙ্গে যাদের নাম জড়িয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক ও বর্তমান রাজনীতিবিদ, ধনকুবের ব্যবসায়ী, রাজপরিবারের সদস্য, নামকরা বিজ্ঞানী ও সেলিব্রিটি | যদিও সবাই অপরাধে জড়িত ছিলেন—এমন প্রমাণ নেই, তবে এপস্টিনের কর্মকাণ্ডে এত দীর্ঘ সময় ধরে আইনি ছাড় পাওয়ার পেছনে এই সম্পর্কগুলো বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিন একই কৌশল ব্যবহার করে অভিজাত বিজ্ঞানী মহলেও ঢুকে পড়েছিলেন। বিশিষ্ট কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমন কয়েকজন বিজ্ঞানী হলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-মান, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক স্টিফেন হকিং, বিবর্তনবিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গুল্ড এবং স্নায়ুতত্ত্ববিদ জর্জ এম চার্চ।
এপস্টিন বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার খরচ বহন করতেন। তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক সভারও আয়োজন করতেন। সেখানে ব্যয়বহুল খাবার খেতে খেতে বিজ্ঞানীরা তাঁদের মতামত ভাগাভাগি করতেন। পরে অনেক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, বিভিন্ন কাজে তহবিল পাওয়ার আশায় তাঁরা এপস্টিনের অপরাধমূলক ইতিহাসের দিকে নজর দেননি। এপস্টিন হার্ভার্ড বিশ্বিব্যালয়ের ইভোল্যুশনারি ডাইনামিকস প্রোগ্রাম-এ ৬৫ লাখ ডলারের অনুদান দিয়েছিলেন। এপস্টিনের অনুদানে যেসব কনফারেন্স হতো, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসে আয়োজন করা হতো। সেখানে উড়োজাহাজে করে অতিথিদের নিয়ে আসা হতো এবং তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে তাঁদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। একবার স্টিফেন হকিংসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এপস্টিনের চার্টার্ড সাবমেরিনে উঠেছিলেন।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার বলেছেন, এপস্টিন একবার তাঁকে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে তাঁর সহকর্মী গণিতজ্ঞ ও জীববিজ্ঞানী মার্টিন নোয়াক এবং পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই আলোচনা এপস্টিনের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। হার্ভার্ডের এক আলোচনা সভায় এপস্টিন দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকট কমানো ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এ ধরনের উদ্যোগ জনসংখ্যা বাড়িয়ে দেবে। হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এপস্টিনের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে পিঙ্কার যুক্তি দেখিয়েছিলেন, শিশু মৃত্যুহার বেশি হলে বরং পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেয়।
জেলখানায় রহস্যজনক মৃত্যু
১০ আগস্ট ২০১৯। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারে বন্দি অবস্থায় এপস্টিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়—আত্মহত্যা কিন্তু—সিসিটিভি ক্যামেরা অকার্যকর ছিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, এর আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়, এসব কারণে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়।
পরবর্তী প্রভাব ও উত্তরাধিকার
এপস্টিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মামলা শেষ হলেও, প্রশ্ন শেষ হয়নি। ভুক্তভোগীরা এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তার সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল পরবর্তীতে দোষী সাব্যস্ত হলেও, এপস্টিনের নেটওয়ার্কের পুরো চিত্র আজও অস্পষ্ট। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় আনে—ক্ষমতার অপব্যবহার, ধনীদের জন্য আলাদা আইন, ভুক্তভোগীদের নীরবতা ও ভয়।
বিআলো/তুরাগ



