স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি
ড. তৌফিক জোয়ার্দার : সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নতির জন্য অন্যান্য খাতের সহায়তা প্রয়োজন। যেমন, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সড়ক দুর্ঘটনা কমায়, পরিবেশগত সুরক্ষা দূষণ হ্রাস করে স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং মানসম্মত শিক্ষা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে।
এই ধারণাটি ‘সকল নীতিতে স্বাস্থ্য’ (Health in All Policies) হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা কম হয়। আর তা হলো, স্বাস্থ্যখাত নিজে অন্যান্য খাতের উন্নয়নে কতটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিটি হলো ‘সকল নীতির জন্য স্বাস্থ্য’, যা দাবি করে, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ কেবল মানুষের আরোগ্যের জন্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আমাদের সামনে সমাজের সার্বিক অগ্রগতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে। এই কাঠামোর দিকে তাকালে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (SDG 3) কীভাবে অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরাসরি সহায়তা করে।
দারিদ্র্য বিমোচন (SDG 1) : বাংলাদেশে চিকিৎসার জন্য পকেট থেকে খরচ বা ‘আউট-অব-পকেট’ ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি, প্রায় ৭৪ শতাংশ। পরিবারের একজন সদস্যের বড় কোনো অসুস্থতা একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারকে মুহূর্তেই দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে। অসুস্থতার কারণে কর্মক্ষম মানুষ কাজ হারালে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, একটি শক্তিশালী ও সুলভ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মানুষকে এই আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
মানসম্মত শিক্ষা (SDG 4) : একটি শিশু জন্মের আগে থেকে সুস্বাস্থ্য না পেলে তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশুর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায়, শৈশবে বা কৈশোরে কোনো বড় স্বাস্থ্যগত ধাক্কা শিশুর স্কুল জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তার পড়াশোনার মান কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করছে, যা তাদের শিক্ষার হার এবং মানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুস্থ শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষিত প্রজন্ম।
নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা (SDG 5) : মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নারীর ক্ষমতায়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। যখন একজন নারী তার সন্তান সংখ্যা এবং জন্মদানের সময় নির্ধারণের স্বাধীনতা পান, তখন তিনি নিজের শিক্ষা ও কর্মজীবন নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারেন। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে যে সাফল্য এসেছে, তার ফলে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা বেড়েছে। সুস্থ মা মানেই একটি সুস্থ পরিবার এবং কর্মঠ নারীশক্তি, যা জেন্ডার সমতা অর্জনের পথে দেশকে এগিয়ে নেয়।
শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG 8) : একটি দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো তার কর্মক্ষম জনশক্তি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি বা প্রবাসী আয়ের দিকে তাকালে আমরা দেখি, এর চালিকাশক্তি হলো লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষক। এই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি সুস্থ না থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং দেশের রপ্তানি আয় কমে যায়। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও কর্মঠ প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করবে।
বৈষম্য হ্রাস ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান (SDG 10 and 16) : একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সমাজের বৈষম্য কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে। যখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায়, তখন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যবান নাগরিকেরা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বেশি অংশগ্রহণ করে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতকে কেবল একটি খরচ বা সেবামূলক খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা শিক্ষা, অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ দেশের প্রতিটি উন্নয়ন সূচককে শক্তিশালী করে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত স্বাস্থ্যখাতকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, এটিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ইঞ্জিন হিসেবে বিবেচনা করা এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। সেই সাথে, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর উচিত স্বাস্থ্যখাতে অধিক মনযোগ দেওয়া। কারণ, তা কেবল স্বাস্থ্যখাতে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য খাতের অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যনীতি, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর।
বিআলো/আমিনা



